কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি

কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি । একটি আদর্শ কোয়েল পাখি খামারের বৈশিষ্ট্য

কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি – বর্তমানে আমাদের দেশে খামার পদ্ধতিতে পশুপাখি পালন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ এর পেছনে কোয়েল পাখি এর অবদান সর্বাধিক ৷ অল্প খরচে বেশি লাভ করা যায় কোয়েল পাখি পালন করে ৷

এই পাখির বানিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম ৷ কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি নিয়ে তাই অনেকের মনেই সুপ্ত জিজ্ঞাসা রয়েছে ৷ আজকে কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি ও এ সম্পর্কিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর আলোকপাত করা হবে ৷ 

কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি 

কোয়েল পাখি আকৃতিতে ছোট হওয়ায় এর লালন-পালন অত্যন্ত সহজ ৷ আবার একাধিক পদ্ধতিতেও কোয়েল পাখি পালন করা যায় ৷ যার একটি হচ্ছে লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পাখি পালন অপরটি হচ্ছে খাঁচায় কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি ৷ 

লিটার পদ্ধততে কোয়েল পাখি পালন 

লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পাখি পালন তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ৷ লিটার পদ্ধতিতে কোয়েল পাখি পালন করতে চাইলে, ঘরের মেঝেতে বালু,কাঠের গুুুড়া,তুষ বা চিটা পাচ থেকে সাত ইঞ্চি পুরু করে বিছিয়ে দিয়ে তার উপরে কোয়েল পাখি পালন করা হয় ।  এরূপ পদ্ধতিকে লিটার পদ্ধতি বলা হয় ৷ 

খাঁচায় কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি 

খাঁচায় কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতিতে লিটার পদ্ধতি থেকে বেশি খরচ হয়ে থাকে ৷ তবে খাঁচা পদ্ধতিতে বেশ কিছু সুবিধাও পাওয়া যায় ৷ বাশ বা লোহা/স্টিল দিয়ে খাঁচা বানিয়ে তার মধ্যে কোয়েল পাখি পালনের প্রক্রিয়া কেই খাঁচায় কোয়েল পাখি পালন হিসেবে অভিহিত করা হয় ৷

কোয়েল পাখির খামার 

বানিজ্যিকভাবে কোয়েল পাখি পালনে খামারের গুরুত্ব অপরিসীম ৷ নিচে কোয়েল পাখির খামারের বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো ৷

লিটার পদ্ধততে কোয়েল পাখির খামার  :

লিটার

কোয়েল পাখির খামার বা পোল্ট্রির ঘরে কোয়েলের বিছানা হিসেবে ব্যবহার করা হয় এমন বিভিন্ন বস্তুকে লিটার বলা হয়ে থাকে ৷ যদি আমরা এক কথায় বলতে যাই তবে কোয়েলের বাসস্থানকে আরামদায়ক করার জন্য কোয়েলের ঘরে যে বিছানা ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাই হচ্ছে লিটার ।

লিটারের উপকরণ :  

লিটার বা কোয়েল পাখির বিছানা হিসেবে সাধারণত ব্যবহৃত হয় ধানের তুষ, করাত কলের কাঠের গুঁড়া, ধান বা গম মাড়াই করার পর বের হওয়া শুকনো খড়ের টুকরো, কাঠের ছিলকা, বিভিন্ন ধরণের বাদামের খোসার গুঁড়া ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়ে থাকে ৷ লিটারের একাধিক উপকরনকে একসঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভাল ।

লিটার প্রস্তুতকরণ : 

এটি প্রস্তুত করতে আগে ৩-৪ সে.মি. পুরু করে লিটার প্রস্তুতকরণ সামগ্রী মেঝে পরিস্কার করে তাতে সুন্দরভাবে বিছিয়ে দিতে হবে ৷

পরবর্তীতে আরো লিটার সামগ্রী এর সঙ্গে দিয়ে ৪-৫ সপ্তাহের মধ্যে এই পুরুত্বের হার ৬ সে.মি.-এ উন্নীত করতে হবে ৷

আর যেসকল বাচ্চা ব্যাটারি ব্রুডারে বড় হয়েছে, সেসকল বাচ্চার জন্য আগেই ৬ সে.মি. পুরু করে লিটার তৈরি করতে হবে ৷

লিটারের পরিবেশ যেন ভালো হয়, সেজন্য তাজা লিটার সামগ্রী দেওয়ার পরপরই যেকোনো ভালো ও কার্যকরী জীবাণুনাশক স্প্রে করে দিয়ে দিতে হবে ৷ মনে রাখবেন, কোয়েলের বাচ্চা নামানোর ৩ দিন আগেই জীবাণুনাশক দেওয়ার কাজ শেষ করতে হবে ৷

>> মরিচ চাষ কিভাবে করবেন? মরিচ চাষ পদ্ধতি একনজরে দেখে নিন!

লিটারের পরিচর্যা :
  • উৎকৃষ্ট লিটারের আর্দ্রতা সবসময় ২৫-৩০% হওয়া উচিত ৷
  • অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে ৷
  • লিটারের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ রক্ষার জন্য ঘনঘন লিটার উল্টেপাল্টে দিতে হবে ৷
  • ঘরে বায়ু চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে ৷
  • বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে ৪-৫ কেজি/১০ ঘনমিটার জায়গা (ফ্লোর এরিয়া) হিসেবে লিটারে কলিচুন (স্ল্যাকড লাইম) যোগ করতে হবে ৷
  • পানির পাত্রের চারদিকের ভেজা লিটার বদলে তাজা লিটার সামগ্রী দিতে হবে ৷
  • অতিরিক্ত গরমে লিটারের আর্দ্রতা কমে গেলে স্প্রে’র মাধ্যমে পানি ছিটিয়ে আর্দ্রতা ঠিক রাখতে হবে ৷

খাঁচা পদ্ধততে কোয়েল পাখির খামার : 

খাঁচা পদ্ধতিতে কোয়েল পালনে লোহা,জি আই তার দিয়ে কোয়েলের জন্য বিশেষভাবে খাঁচা তৈরি করা হয় । বাঁশ-কাঠ দিয়েও খাঁচা বানানো যায় । বাঁশের খাঁচা থেকে লোহার খাঁচা বেশি টেকসই ও ভাল মানের হবে।

খাঁচায় মেঝে তৈরি করার সময় খাঁচার সামনের দিকে হাল্কা ঢালু করে তৈরি করতে হবে যাতে করে পাখি খাঁচায় ডিম পাড়লে সেই ডিম যেন খাঁচার সামনে চলে আসে ।

খামারের খাঁচার একপাশে লম্বা করে খাবারের জন্য পাত্র ও পানির জন্য পাত্র তৈরি করে লাগাতে হবে ।

বাজারে কোয়েলের যে বানিজ্যিক খাঁচা বা খামারের জন্য যে খাঁচা পাওয়া যায় তার বৈশিষ্ট্য হচ্ছেঃ 

  • খাঁচার দৈর্ঘ্য হয় প্রায় ৫-৬ ফুট পর্যন্ত
  • খাঁচার প্রস্থের মাপ হয় ২.৫ ফুট (ভিতরের জন্য জায়গা ২ ফুট আর বাইরের সামনের দিকের ডিমের ট্রে এর জন্য ০.৫ ফুট) ।
  • খাঁচায় তাকের সংখ্যা থাকে সর্বনিম্ন ৫ টি করে ৷
  • খাঁচার প্রতিটি তাকের উচ্চতা হয় কমপক্ষে ১০-১২ ইঞ্চি সাইজের ৷ 
  • তাকপ্রতি ১০০ টি করে পাখি পালন করা যায় ৷
  • একটি সম্পূর্ণ খাচায় পাখি লালন-পালন করা যাবে ৫০০ টি করে !
  • ৫০০ টি পাখির খাঁচা তৈরি করতে সব মিলিয়ে খরচ পরবে ১৫-১৮ হাজার টাকা ।

একটি আদর্শ কোয়েল পাখি খামারের বৈশিষ্ট্য

কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি অনুযায়ী আদর্শ কোয়েল পাখির খামারের কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে ৷ যেমনঃ

১. পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ ও বের হবার মতন হতে হবে ৷

২. পূর্ব-পশ্চিম বরাবর খামার লম্বা হয়ে থাকে ৷

৩. বিড়াল,ইদুরের উৎপাত থেকে মুক্ত থাকে ৷

৪. গরম বেশি অনুভূত হলে ফ্যানের ব্যবস্থা ও শীত বেশি লাগলে হিটিং ব্যবস্থা থাকে ৷ 

৫. পরিমানমতো পানি ও খাবারের পাত্র খামারে থাকে ৷

৬. খামারে পর্দার ব্যবস্থা থাকে ৷

কোয়েল পাখির খাবার : 

বয়স ভেদে কোয়েল পাখির খাবারে ভিন্নতা রয়েছে ৷ সাধারণত বাচ্চা কোয়েল অর্থাত শূন্য থেকে পচিশ দিন বয়সী বাচ্চা কোয়েলকে স্টার্টার ফিড দিতে হয় ৷ গ্রোয়ার ফিড স্টার্টার ফিডের পরে দিতে হয় ৷ কোয়েল পাখি ডিম দেওয়ার সপ্তম দিন পর্যন্ত গ্রোয়ার ফিড চলমান থাকবে ৷ এরপর প্রয়োজন পরবে লেয়ার ফিডের ৷ গ্রোয়ার ফিড শেষ করে কোয়েলকে লেয়ার ফিড দিতে হবে ৷

এগুলো মুদির দোকান বা মুরগির খাবার বিক্রি করে এরকম দোকানে পেয়ে যাবেন ৷ 

কোয়েল পাখি কত দিনে ডিম পাড়ে? 

একটি পূর্ণাঙ্গ কোয়েল পাখি সাধারণত ৬-৮ সপ্তাহ বয়সের সময় ডিম দেওয়া শুরু করে ও বছর প্রতি প্রায় ৩০০ টি ডিম দিয়ে থাকে ৷

>> ভালো ল্যাপটপ / কম্পিউটার চেনার উপায় সমূহ একনজরে দেখে নিন!

কোয়েল পাখির অসুখ-বিসুখ

কোয়েলের সাধারণত কোন অসুখই হয়না ৷ তথাপি যা হয় তার পিছনে থাকে জীবানু ৷ এজন্য কোয়েলের খামারে প্রবেশের আগে হাত-পা জীবানুনাশক ব্যবহার করে ধুয়ে নিতে হবে ৷ 

হঠাৎই যদি কোন অসুখ হয় তবে নিকটস্থ ভেটের নিকট যেতে হবে ৷ আর অসুস্থ পাখিকে আলাদা করে ফেলতে হবে অন্যদের থেকে ৷ 

শেষ কথা 

কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি অনুসারে ফার্ম করে কোয়েল পালন লাভজনক ৷ প্রতি ১,০০০ কোয়েল পালনে মাসিক ৫-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায় ৷ তবে খামার করবার আগে প্রশিক্ষন গ্রহণ করলে তাতে ভালো ফলাফল লাভ করা যাবে ৷ 

ডিম কোথায় বিক্রি করতে পারবে ৷ তাতে খরচ ও ডিমের মূল্য হিসেব কষে সে অনুপাতে কোয়েল পাখি পালন পদ্ধতি অনুসরণে পালন করুন ৷

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top